গ্রামে মেলা মানেই আমাদের মন একরকম নস্টালজিক হয়ে যায়। রঙিন আলোর মাঝে শিশুদের খিলখিল হাসি, বাদ্যযন্ত্রের সুর, পুতুল নাচের তালে তালে মুগ্ধ দর্শক সবকিছুই এক অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম দেয়। কিন্তু এই সুন্দর মেলার পিছনে লুকিয়ে থাকে কিছু অন্ধকার দিক, যা আমাদের আনন্দকে ম্লান করে দেয়। আজ আমি সেই এক দুঃখজনক বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই, যা হলো গ্রামীণ মেলায় নারী শিল্পীদের উত্ত্যক্ত করা এবং সেই আপত্তিকর মুহূর্তগুলো ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া।

আমাদের গ্রামবাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর ইতিহাসের সাথে মেলা এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। মেলা মানেই এক মেলবন্ধন, যেখানে শহুরে জীবনের কোলাহল থেকে দূরে গ্রামের শান্ত পরিবেশে কিছুটা সময় কাটানো যায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এই মেলা অনেক সময় নারীদের জন্য নিরাপত্তাহীনতার এক নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। নারীরা মেলায় অংশগ্রহণ করতে গেলে একদিকে যেমন তাদের নিজের সুরক্ষার বিষয়টি মাথায় রাখতে হয়, অন্যদিকে আবার তাদের সম্মানও রক্ষার চেষ্টা করতে হয়।

আমি নিজেও একবার এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলাম। কিছুদিন আগে এক বন্ধুর সাথে একটি গ্রামীণ মেলায় গিয়েছিলাম। সেখানে আমরা দেখলাম, কিশোরদের একটি দল এক নারী শিল্পীর পারফর্মেন্স দেখছিল। তারা একের পর এক তার দিকে বাজে মন্তব্য ছুঁড়ে দিচ্ছিল এবং তার ভিডিও ধারণ করতে ব্যস্ত ছিল। আমার মনে হলো, এই ছেলেরা আদৌ জানে না তারা কত বড় অপরাধ করছে। ওই নারী শিল্পী তাদের এসব কটূক্তি এবং ভিডিও ধারণের কারণে স্পষ্টতই অস্বস্তি বোধ করছিলেন, কিন্তু কিছুই করার ছিল না তার।

তাদের এই আচরণ শুধুমাত্র সেই নারী শিল্পীর জন্য নয়, আমাদের সমাজের জন্যও লজ্জাজনক। আমরা কি আসলেই এমন একটি সমাজে বাস করছি, যেখানে একজন নারী তার শিল্পের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করতে চাইলেই তাকে এমন অসম্মানের সম্মুখীন হতে হবে? নারীরা তাদের প্রতিভা আর মেধা দেখাবার জন্য মেলায় অংশগ্রহণ করে। কিন্তু সেখানে তারা যদি নিরাপত্তাহীনতার শিকার হয়, তাহলে সেটা আমাদের সমাজের জন্য বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন রেখে দেয়।

যারা এই ধরনের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়, তাদের উদ্দেশ্য মূলত মজার ছলে বা ভাইরাল হওয়ার জন্য। কিন্তু তারা কখনও কি ভেবে দেখেছে, এর ফলে একজন নারীর মানসম্মান কীভাবে ধূলিসাৎ হচ্ছে? তারা কি জানে না, এমন ভিডিও শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ক্ষতির সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সমাজের জন্যও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে? এই ধরনের ঘটনা নারীদের উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে, যাতে তাদের পরবর্তী সময়ে মেলায় অংশগ্রহণ করতেও দ্বিধা হয়।

আমি মনে করি এখানে কিছু প্রশ্ন আমাদের নিজেদেরকেই করতে হবে। কেন আমরা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারছি না, যেখানে একজন নারী নিশ্চিন্তে তার প্রতিভা প্রদর্শন করতে পারবে? কেন আমরা মেলায় যাওয়া নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছি না? এই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের চিন্তাভাবনা করা দরকার, বিশেষ করে যারা মেলায় যান তারা যেন সচেতন হন এবং এই ধরনের আচরণ থেকে বিরত থাকেন। মেলার আয়োজকদেরও এই ধরনের ঘটনাগুলোর প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

এখন সময় এসেছে, আমরা সকলে মিলে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ধরনের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই। আমাদের উচিত এ ধরনের ভিডিওর প্রচার না করা এবং যারা এগুলো শেয়ার করে তাদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেওয়া। আমাদের নিজেদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং অন্যদেরকেও সচেতন করতে হবে। সামাজিকভাবে এই ধরনের ঘৃণ্য আচরণের বিরুদ্ধে আমরা জোরালো প্রতিক্রিয়া জানাতে পারলেই কেবল পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব।

শেষ করার আগে একটাই কথা বলতে চাই, মেলা আমাদের সংস্কৃতির একটি সুন্দর অংশ, কিন্তু এর সাথে সাথে আমাদের সম্মানও রক্ষা করা উচিত। নারীরা যেন তাদের প্রতিভা আর মেধা পুরোপুরি উপভোগ করতে পারে, সেটি নিশ্চিত করাই আমাদের দায়িত্ব। মেলায় আমরা যেভাবে আনন্দিত হই, তেমনই আমাদের উচিত সেই আনন্দ অন্যদের জন্যও নিশ্চিত করা। আমরা যদি নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং আচরণের পরিবর্তন আনতে পারি, তবে একদিন হয়তো আমরা এমন একটি সমাজ পাবো, যেখানে মেলা হবে সবার জন্য নিরাপদ এবং আনন্দময়। এই পরিবর্তন কি আমরা আনতে পারবো? এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিজেদেরই খুঁজে নিতে হবে।

By pragra