বাংলাদেশের মানুষের জন্য মানবাধিকার কোনো নতুন বিষয় নয়। তবে সময়ের সাথে সাথে, আমরা লক্ষ্য করছি যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো অনেক সময় নথিভুক্ত হয় না, অথবা প্রকাশ পায় না। তবে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে রিপোর্ট হওয়া হামলার সংখ্যাটি শূন্য দেখালে কি আদৌ এটি বাস্তবে ঘটেনি? এ প্রশ্নটা কিন্তু মনের গহীনে অনেক আলোড়ন তোলে।

আমরা যখন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, প্রতিদিনের সংগ্রামে টিকে থাকার চেষ্টা করি তখন হয়ত খুব কম সময়ই পাই বসে ভেবে দেখার জন্য আমাদের সবার চারপাশে কী ঘটছে। কিন্তু বাস্তবতা হল, আমাদের আশেপাশেই ঘটছে এমন অনেক ঘটনা যা সঠিক সময়ে প্রকাশ পায়না। কারণ এখানে এমন একটি সমস্যা রয়েছে যা আমাদের সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত। গণমাধ্যম এবং প্রশাসনের মাঝে যখন স্বচ্ছতার অভাব থাকে, তখন এই ধরনের ঘটনা ঘটেই চলে।

গবেষণা বলছে, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের শূন্য নথিভুক্তির বিষয়টি আসলে কাগুজে বাস্তবতা। বাস্তবে কতো ঘটনা যে নথিভুক্ত হয়নি, তার হিসাব কে রাখে? অনেক ক্ষেত্রেই আমরা দেখতে পাই যে সাধারণ মানুষের পক্ষে নিজের অধিকারের জন্য লড়াই করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে গ্রামের দিকে বা ছোট শহরগুলোতে যেখানে তথ্যের প্রবাহ এখনও তেমন সহজলভ্য নয়।

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি আমি ঢাকার বাইরে একটি ছোট্ট শহরে কয়েক বছর আগে এক আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেখানে দেখেছিলাম, গ্রামের এক কৃষক তার জমির মালিকানা নিয়ে সমস্যায় পড়েছেন। কিন্তু তার পক্ষে সঠিক জায়গায় অভিযোগ করা এতটাই কঠিন ছিল যে, তিনি শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। এই ধরনের ঘটনা একটি দুটো না, হাজার হাজার। তারা কোথাও নথিভুক্ত হয় না। কারণ তাদের কাছে পৌঁছানোর রাস্তা অনেক জটিল।

প্রতিটি সমাজেরই একটি নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে প্রতিটি সদস্যের অধিকার রক্ষা করা। তবে আমাদের সমাজে কিছু অসুবিধা রয়েছে যা আমাদের এই দায়িত্ব পালনে বাঁধা সৃষ্টি করে। যেমন কোনো ঘটনা ঘটে গেলে, তা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করার মতো মানসিকতা আমাদের মাঝে তৈরি হয়নি। গণমাধ্যমেরও কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট স্বার্থ থাকতে পারে, যা তাদের কোন ঘটনার প্রচার নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

প্রতিদিন খবরের কাগজে বা টেলিভিশনে রিপোর্ট হওয়া ঘটনার সংখ্যা অনেক, কিন্তু তার মধ্যে আসল সত্যটা কতটুকু উঠে আসে? সত্যিই কি সব ঘটনা ঠিক মতো নথিভুক্ত হয়েছে? অথবা কিছু ঘটনা কি চাপা পড়ে গেছে কোনো বিশেষ স্বার্থে? এ প্রশ্নগুলো আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। আমরা জানি, গণমাধ্যমের কাজ হল সত্যের সন্ধান করা এবং তা সবার সামনে তুলে ধরা। কিন্তু যখন এই সিস্টেমেই কিছু অসুবিধা দেখা দেয়, তখন আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, আমাদের জীবনের নিরাপত্তা কতটা?

মাঝেমাঝে মনে হয়, আমরা কি এমন এক সমাজে বাস করছি যেখানে ব্যক্তির নিরাপত্তা এবং তার অধিকার সঠিক মানে মেনে চলা হয় না? যদি সত্যিই তাই হয়, তবে আমাদের উচিত এ নিয়ে ভাবনা চিন্তা করা। আমাদের উচিত নিজেদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা এবং সর্বপ্রথম নিজেকে সুরক্ষিত রাখা।

তাহলে আসুন, আমরা প্রত্যেকে একে অপরের সম্মান এবং অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই। আমাদের সমাজে যে ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, তা বুঝতে চেষ্টা করি এবং তার অতলে লুকিয়ে থাকা সত্যকে আলোর মুখ দেখানোর চেষ্টা করি। কারণ একই সমাজে বাস করছি আমরা সবাই। আমাদের সবারই নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে। আর বাস্তবিকভাবে, এটি আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ।

প্রশ্ন হল, আমরা কি পারবো সমাজের এই অসঙ্গতিগুলো শুধরে দিতে? আমরা কি জানুয়ারি থেকে জুনের মতো অন্য সময়গুলোতেও এই ধরনের শূন্য রিপোর্টের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা ঘটনাগুলোর সত্যতা উদ্‌ঘাটন করতে পারবো? এটা আমাদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। একটি সমাজের উন্নয়নে সবারই যে ভূমিকা থাকতে হয়, সেটা কি আমরা মনে রাখছি? কী বলো তোমরা?

By pragra