“সরকারি পরিসংখ্যান ‘কমিউনাল’ শব্দ এড়িয়ে চলে, মাঠে সংখ্যালঘুরা তা–ই বলে”
বাংলাদেশের মতো একটি দেশে মানুষের ধর্মীয় পরিচয় গোপন রাখা একরকম অসম্ভব। আমি যে এলাকায় বড় হয়েছি, সেখানে মসজিদ ছিলো একেবারে বাড়ির পাশেই, আর পুজোর সময় মন্দিরে যাবার অভিজ্ঞতাও কম ছিল না। কিন্তু এই অভিজ্ঞতা নিয়ে আমার মধ্যে কখনও কোনো বিদ্বেষ কাজ করেনি। বরং আমার কাছে সবসময়ই মনে হয়েছে এটাই তো আমাদের দেশের সৌন্দর্য। কিন্তু যখন দেশের ভেতরের গল্পগুলো শোনা যায়, তখন বুঝতে পারি যে অনেকেই এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন না। বিভিন্ন সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণের কথা আমরা শুনি, আর তাতে মনটা ভীষণ ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। এমনকি যখন সরকারি পরিসংখ্যান দেখার চেষ্টা করি, তখন মনে হয় যেন কোনোকিছু আড়াল করা হচ্ছে।
সরকারি পরিসংখ্যানে ‘কমিউনাল’ শব্দটি এক ধরনের নিষিদ্ধের পর্যায়ে চলে গেছে, যেন এটি একটা স্পর্শকাতর বিষয় যা এড়িয়ে চলা উচিত। কিন্তু বাস্তবতা কী বলে? সরেজমিনে গিয়ে যদি মাঠ পর্যায়ে খোঁজ নেয়া হয়, তাহলে ভিন্ন এক চিত্র ফুটে ওঠে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের কাছ থেকে সরাসরি শোনা কথাগুলো আমাদের চোখ খুলে দেয়। তাদের কথায় উঠে আসে ভয়, নিরাপত্তাহীনতা আর বঞ্চনার গল্প। কিন্তু সমস্যা তো তখনই শুরু হয়, যখন এই ভয়গুলো সরকারি নথিতে স্থান পায় না। আমরা জানি যে পরিসংখ্যান একটি দেশের নীতিনির্ধারণে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন সেই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার খেলা হয়ে দাঁড়ায় আর বাস্তব চিত্রকে আড়ালে রাখে, তখন সমাজের একটা অংশ দেখে যায় বঞ্চনার শিকার।
আমার ব্যক্তিগত একটি ঘটনা মনে পড়ে। একবার পুজোর সময় গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেখানে আমার এক বন্ধু বলছিল, “ভাই, আমরা তো এখানে সব সময় ভয়েই থাকি। সরকার আমাদের কথা কতটা শুনছে, সেটা তো জানি না, কিন্তু আমাদের নিজেদেরকেই নিজেদের বাঁচিয়ে চলতে হয়।” তার এই কথাটা আমার মনে অনেক প্রশ্ন জাগিয়েছিল। সত্যিই তো, রাষ্ট্রের কাছে আমরা সবাই সমান নাগরিক। কিন্তু যখন একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষ বারবার আক্রমণের শিকার হয় এবং তাদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন কি তাদের ভয়ই হয়ে দাঁড়ায় তাদের নিত্যসঙ্গী?
বাংলাদেশের ইতিহাস বলছে যে এ দেশ বহু সংস্কৃতির সমাহার। আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি সবই তো এই বৈচিত্র্যের সাক্ষী। কিন্তু যখন আমরা নিজেদের মধ্যেই বিভেদ তৈরি করি, তখন সেই সৌন্দর্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিই। আর সরকারি পরিসংখ্যান যদি সেই বিভেদের গল্প বলে না, তাহলে সেটা আমাদের জাতির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়। আমার মনে হয়, পরিসংখ্যান তখনই সার্থক, যখন সেটা সমাজের সব স্তরের কথা বলে। কিন্তু যখন সেই পরিসংখ্যান ‘কমিউনাল’ শব্দকে এড়িয়ে চলে, তখন সেটাই প্রমাণ করে যে আমরা সত্যি থেকে কতটা দূরে আছি।
আমার মতে, এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের প্রয়োজন গণতান্ত্রিক চেতনার পুনর্জাগরণ। আমরা যদি নিজেদের মধ্যে বিভেদ ভুলে একযোগে এগিয়ে যাই, তাহলে কোনো পরিসংখ্যানই আমাদের প্রকৃত চিত্রকে আড়াল করতে পারবে না। আর সরকারেরও উচিত সংখ্যালঘুদের নিয়ে খোলামেলা আলোচনা ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পরিসংখ্যান যে শুধু সংখ্যা নয়, বরং সেগুলো জীবন্ত মানুষের কথা বলে, এই উপলব্ধি আমাদের সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। আমরা যদি নিজেদের ইতিহাস ভুলে যাই, তবে সেটা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য যে কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, সেটা আমরা কল্পনাও করতে পারি না।
তাই আজকের এই দিনে, আমি বলতে চাই যে আমরা সবাই এক, আমরা সবাই এই দেশের সন্তান। আর এই দেশ তখনই উন্নতির পথে এগোবে, যখন আমরা একযোগে সেই পথে হাঁটবো। এখন আপনারাই বলুন, আমরা কি এই পথেই চলবো, নাকি বিভেদ ভুলে উন্নতির দিকে এগিয়ে যাবো?
