অভিযোগ তুলতে গিয়ে নতুন করে হুমকি, থানায় গিয়ে অপমান

ঢাকার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সাথে চা খেতে বসে হঠাৎ তার মুখে শুনলাম এক মর্মান্তিক ঘটনা। সে তার অফিসের বসের বিরুদ্ধাচরণ করে থানায় অভিযোগ তুলতে গিয়েছিলো। প্রথমে হাস্যকর মনে হলেও, পরে বুঝলাম যে ঘটনাটি মোটেও হেসে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। আমাদের সমাজে কতজন মানুষই তো প্রতিদিন এমন সমস্যার সম্মুখীন হয়। কেউ কেউ মুখ বুজে সইয়ে নেয়, আর কেউ বা মুখ খুলে বাঁচার চেষ্টা করে। তবে, সত্যিই কি তারা মুক্তি পায়?

আমার সেই বন্ধুর সমস্যা তার বসের সাথে। সে প্রায়ই অফিসিয়াল কাজের বাইরে ব্যক্তিগত কাজ করতে বাধ্য করত। প্রথমদিকে বিরক্ত হলেও, সে মেনে নিয়েছিলো, যেমনটা আমরা অনেকেই করি। কিন্তু দিন দিন পরিস্থিতি এমন জায়গায় চলে গেল যে সে আর তা সহ্য করতে পারছিল না। একবার তো তার বস রাতে ফোন করে তাকে অফিসের কাগজপত্র নিয়ে আসতে বললো তার বাড়িতে। সে তখন না বলেছিল, আর আগুন লেগে গিয়েছিল সম্পর্কের ভিতরে। তারপর থেকে প্রতিদিনই কোনো না কোনোভাবে তাকে ছোট করা শুরু হলো।

এই পরিস্থিতিতে আমার বন্ধু একদিন মনের জোর নিয়ে স্থানীয় থানায় গেল অভিযোগ করতে। শুনতে হাস্যকর লাগে না? কেউ কি সত্যিই নিজের বসের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করতে যায়? কিন্তু সে গিয়েছিল। যাকে বলে শেষ চেষ্টা। কিন্তু সেখানে গিয়ে সে পেল আরেক ধাক্কা। কোনো অভিযোগের কথা শোনার আগেই তাকে দাঁড় করিয়ে রেখে পুলিশ অফিসার তার দিকে এমনভাবে তাকালো, যেন সে কোন অপরাধ করেছে। অনেক সময় অপেক্ষা করার পর অফিসার অবশেষে তার কথা শুনলেন। কাগজপত্র দেখে, অভিযোগ শুনে বললেন, “এটাও কোনো অভিযোগের বিষয়? তোমার বুকে কি একটুও সাহস নেই? এতো ছোটখাটো ব্যাপার নিয়ে থানায় আসার কোনো দরকার নেই।” তারপর আমার বন্ধু বললো, “স্যার, আমি তো আর এখানে আসতে চাইনি। আমার আর কোনো রাস্তা ছিল না বলেই এসেছি।” তা শুনে পুলিশ অফিসার হেসে বললেন, “তাহলে বোধহয় তোমার চাকরির দরকার নেই।”

এই কথা শুনে আমার বন্ধুর মনে হলো, অভিযোগ তুলতে এসে যেন নিজেই নতুন করে হুমকির সম্মুখীন হলো। যে আশ্রয়ের জন্য থানায় গিয়েছিল, সেই আশ্রয়ই যেন তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। তার মনে হলো, থানায় না এসে যদি বসের হুমকি শোনে, তবুও কি সে একাই লড়াই করতে পারত না?

যে প্রশ্ন তখন আমার বন্ধু নিজেকে করেছিলো, সেই প্রশ্ন আজ আমাদেরও করতে হবে। সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা কি সত্যিই এতোই কঠিন? যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে কতজন মানুষই তো শুধুমাত্র ভয়ে পিছিয়ে যাবেন। তারা কি নিজেদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না? আমাদের সমাজে কে আসলেই তাদের পাশে দাঁড়াবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের গভীরে যেতে হবে। আমাদের দেশের আইনি ব্যবস্থায় এখনও অনেক ফাঁকফোকর রয়ে গেছে। থানায় অভিযোগ তুলতে গিয়ে যদি কেউ অপমানিত হয়, তাহলে সেই ব্যক্তির পক্ষে সাহস জোগানোর জন্য কে এগিয়ে আসবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা আমাদের মনোভাবের দিকে তাকাতে পারি। অনেক সময় আমরা এমনটাই করে থাকি যে একজন অভিযোগকারীকে ‘অবিবেচক’ বা ‘দুর্বল’ মনে করি, যা একেবারেই সঠিক নয়।

এই ভয়ানক অথচ বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে গেলে আমাদের সবারই মানসিক পরিবর্তন দরকার। একজন মানুষ যখন কোনো অন্যায়ের শিকার হয়, তখন তার পাশে থাকার জন্য আমাদের প্রস্তুত হতে হবে। থানায় যদি পুলিশ অফিসারদের আরও সহানুভূতিশীল করা যায়, যদি তাদেরকে আরও প্রশিক্ষণ দিয়ে অভিযোগকারীদের কথা শোনানোর জন্য তৈরি করা যায়, তাহলে হয়তো পরিস্থিতি কিছুটা হলেও উন্নত হতে পারে।

আমাদের সমাজে অনেকেই অভিযোগের ঝামেলায় না জড়াতে চায় না। কারণ তাদের মতে, থানায় গেলে সমস্যার সমাধান হওয়ার বদলে আরও বিপদে পড়ার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু এই মনোভাব পরিবর্তন করা জরুরি। আমরা যদি নিজেদের অধিকার নিয়ে চিন্তা না করি, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী ধরনের সমাজ রেখে যাচ্ছি? এটি ভাবার সময় এসেছে।

আমার বন্ধুর অভিজ্ঞতা থেকে আমরা এই শিক্ষা নিতে পারি যে, যেকোনো সমস্যাকে ছোট ভেবে এড়িয়ে গেলে তা কখনোই সমাধান হয় না। বরং তার সাথে লড়াই করাই হচ্ছে প্রকৃত সমাধান। কিন্তু সেই লড়াই যাতে সফল হয়, তার জন্য আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে উন্নতি আনতে হবে। অভিযোগকারীদের প্রতি সদয় হওয়া, তাদের কথা শোনা এবং সাহস জোগানো খুবই জরুরি। আমরা যদি সত্যিই উন্নত সমাজ গড়তে চাই, তাহলে এই পরিবর্তনের কথা ভাবতে হবে।

শেষ কথা হলো, আমরা কেউই চাই না যে, অভিযোগ তুলতে গিয়ে যেন নতুন করে হুমকি বা অপমানের শিকার হতে হয়। থানায় যাওয়া মানে শুধু আইনের সাহায্য চাওয়া নয়, বরং ন্যায়বিচার পাবার প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশায় যেন আঘাত না আসে, তার জন্য আমাদের সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে। অন্যথায়, আমাদের সমাজে অন্যায়ের প্রতিবাদ কমেই যাবে, আর আমরা তা হতে দিতে পারি না। আমাদের সমাজ আরো সহনশীল ও ন্যায়ের পথে চলুক, এই আশা নিয়ে আজকের দিনের জন্য শেষ করলাম।