জমি বাঁচাতে আদালত–থানা–মিডিয়া ঘুরে হতাশায় ভেঙে পড়া এক পরিবার
বাংলাদেশে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ এক নতুন কিছু নয়। তবে যখন নিজের পরিবারকে এই গঠনভুক্ত লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে দিতে হয়, তখন যারপরনাই হতাশা নেমে আসে মনে। একটি পরিবার কিভাবে তাদের পরিবারের সম্পত্তি রক্ষা করতে আদালত, থানা এবং মিডিয়ার দ্বারে দ্বারে ঘুরে, শেষমেশ ভেঙে পড়ে এটি একেবারে সাধারণ অথচ হৃদয়বিদারক গল্প। গল্প বলছি এক গরিব পরিবারের, যারা তাদের শেষ সম্বলটুকু রক্ষা করতে উঠে পড়ে লেগেছিল।
আমার এক বন্ধু, রফিকুল, তার পরিবারের জমি বাঁচাতে গত বছর এই চক্রের মধ্যে পড়েছিল। রফিকুলের পরিবার ছিল পূর্বপুরুষদের একটি ছোট্ট জমি, যা তাদের জীবিকার মূল উৎস। কিন্তু হঠাৎ করেই একদিন একটি প্রভাবশালী ব্যক্তি সেই জমির উপর তাদের অধিকার দাবি করে বসে। বিচারালয়ে যাবার আগেই নানা হুমকি ধমকি শুরু হয়। জমির কাগজপত্র সাজানো হচ্ছে, নকল দলিল তৈরি হচ্ছে, এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের দিয়ে ভয় দেখানো হচ্ছে।
প্রথমে রফিকুল এবং তার পরিবার স্থানীয় থানায় যায়। কিন্তু তারা কোন ধরনের সহযোগিতা পায়নি। তাদের অভিযোগ গ্রহণ করা হলো না। উপায় না দেখে, রফিকুলের পরিবার আদালতের শরণাপন্ন হয়। কিন্তু যারা এই সিস্টেমের ভেতর লড়াই করেছে, তারা জানেন কতটা জটিলতা আর ধৈর্যের দরকার এসব মোকাবেলা করতে। বিচারালয় তো আর একদিনে বিচার করে ফেলতে পারে না। এর মধ্যে চলতে থাকে নানা ধরনের হুমকি।
থানার পর এবার রফিকুলের পরিবার মিডিয়ার শরণাপন্ন হলো। তারা চেয়েছিল এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ গড়ে তুলতে। যদিও কিছু মিডিয়া তাদের বিষয়টি নিয়ে রিপোর্ট করেছিল, তবুও প্রভাবশালীরা আইনের চেয়ে বেশি ক্ষমতাধর ছিল। প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করা কতটা কষ্টকর হতে পারে, সেটি তারা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল।
সবচেয়ে মর্মান্তিক ছিল যখন তাদের আদালতে গিয়েও বারবার কোর্টে হাজিরা দিতে হয়, কিন্তু কোনো সমাধান মেলে না। বিচারালয়ে থাকার সময়টুকুও যেন তাদের এক নীরব অত্যাচার। দিন দিন তাদের হতাশা বাড়ছিল। আর এই হতাশা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, তারা শেষমেশ ভেঙে পড়ে।
রফিকুলের পরিবার কেবল নিজেদের জায়গা রক্ষা করতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের এই লড়াইয়ের ফল হয়েছে উল্টো। তাদের মনোবল ভেঙে যায়, আর তারা বুঝতে পারে, এ লড়াইয়ে জয়ী হওয়া তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। তাদের অবস্থান থেকে সরিয়ে নিতে তাদের বাধ্য করা হয়। এটি কেবল রফিকুল বা তার পরিবারের গল্প নয়, এটি হাজারো পরিবারের কাহিনী যারা প্রতিদিন জমি রক্ষা করতে সংগ্রাম করছে।
এ ধরনের গল্প আমাদের সমাজের জন্য কতটা লজ্জাজনক! আমরা একবিংশ শতাব্দীতে বাস করছি, কিন্তু আমাদের বিচারব্যবস্থা এখনও ধীরগতির। অনেক সময় দেখা যায়, প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিজেদের স্বার্থে আইনের অপব্যবহার করেন। ফলে সাধারণ মানুষ তাদের অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে হতাশা আর কষ্টের মধ্যে দিন কাটায়।
যদি আমরা সত্যিই আমাদের সমাজে পরিবর্তন আনতে চাই, তাহলে আমাদের এই সমস্যাগুলোর মূলে যেতে হবে। বিচারব্যবস্থা এবং প্রশাসনের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। আর এক্ষেত্রে মিডিয়ারও দায়িত্ব রয়েছে। তাদের উচিত এই ধরনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে আরও জোরালো ভূমিকা পালন করা।
তাহলে প্রশ্ন হলো, এই অবস্থার পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব? আমাদের কি নতুন কোনো উদ্যোগ নিতে হবে, নাকি যে সিস্টেম রয়েছে সেটাই আরও কার্যক্ষম করতে হবে? সমাজের প্রভাবশালীদের কীভাবে বোঝাবো যে, তারা নিজেদের স্বার্থের উপরে দেশের মানুষের অধিকারকে স্থান দিতে হবে?
একটা পরিবার তাদের জমির জন্য আদালত, থানা, মিডিয়া ঘুরে হতাশায় ভেঙে পড়ে গেলে, আমাদের সমাজের জন্য সেটা লজ্জার। আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত এর বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা, যাতে ভবিষ্যতে অন্য কোনো পরিবারকে এভাবে ভেঙে পড়তে না হয়। আমাদের প্রয়োজন এমন একটি সমাজ যেখানে ন্যায়বিচার প্রতিটি মানুষের কাছে সহজলভ্য হবে, না হলে রফিকুলের মতো হাজারো রফিকুল থেমে যাবে এই লড়াইয়ে।
