প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ যখন আন্তর্জাতিক মিডিয়ার শিরোনামে উঠে এলো, আমাদের সকলের মনেই একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া হল। কিছুটা গর্ব, কিছুটা হতাশা কারণ এই শিরোনাম ছিল ২০২১ সালের শেষ প্রান্তিকে ঘটে যাওয়া অ্যান্টি-হিন্দু ভায়োলেন্স নিয়ে। আমাদের দেশের সম্প্রীতির বুনন বুঝি আরেকটু আলগা হয়ে গেল!

আমাদের বাংলাদেশ, পাশ্চাত্যের চোখে এক নবীন দেশ। কিন্তু এর বহু পুরানো সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য। স্বাধীনতার পর থেকে আমরা নানা ধরনের চাপের মধ্য দিয়ে গেছি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক। আর এর মাঝেই বড় বড় বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখে আমাদের ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং সম্প্রীতির পরীক্ষা নেয়া হয়েছে। ফলে, ২০২১ সালে যখন এই বিরোধের ঘটনা আন্তর্জাতিক মিডিয়ার আলোচনায় এলো, তখন আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, কেন? কিভাবে?

এই বছরটা কোনোভাবেই পুরোপুরি সুখকর ছিল না। মহামারি, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, এবং তারপর এই ধর্মীয় সহিংসতা, সব মিলিয়ে আমাদের মনোবল কিছুটা হলেও নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল। এমন একটা সময়ে যখন আমরা সামনের দিকে এগোনোর চেষ্টা করছি, তখন এমন একটি বিষয় সামনে আসা অবশ্যই হৃদয়বিদারক। যে দেশটির মাটিতে বৌদ্ধ, হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান সবাই মিলে নিজ নিজ ঐতিহ্যে মিশে যেতে পারে, সেখানে এমন সহিংসতার ঘটনা কিভাবে ঘটে? এই প্রশ্ন মনে আসাই স্বাভাবিক।

ব্যক্তিগতভাবে, আমার মনে হয় আমাদের দেশের কোনো একটি অংশে এখনও অন্ধকার দিক আছে, যা আমরা আলোতে আনতে পারিনি। এই অন্ধকার হলো উগ্রবাদ, যা কোনো এক বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রতি অবজ্ঞা আর অমানবিকতা নিয়ে এসেছে। ধর্মের নামে যে হিংসা আর অন্ধত্বের বীজ বোনা হয়েছে, তা আমাদের সমাজের কিছু মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। আর এই বিভেদকে পুঁজি করে ঘটে যায় এমন অমানবিক ঘটনা। অথচ, ধর্মের মূল মন্ত্রটাই তো শান্তি আর সহনশীলতা। সুতরাং, এখানে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, আমরা কি সত্যিই আমাদের ধর্মের মর্মার্থ বুঝতে পেরেছি?

অ্যান্টি-হিন্দু ভায়োলেন্সের ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের দেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যদিও, এতে আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ কোনোভাবেই জড়িত নয়, তবুও এর প্রভাব পড়েছে আমাদের সকলের উপর। আন্তর্জাতিক মিডিয়া যখন এই ধরনের ঘটনা কভার করে, তখন তারা প্রায়ই মূল ঘটনাকে না জেনেই কিছুটা অতিরঞ্জন করে। ফলে, দেশের বাহিরে যারা রয়েছেন, তারা হয়তো ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখেন। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এর ফলে বিদেশে থাকা আমাদের ভাই-বোনেরা হয়রানির শিকার হন।

আমার মনে হয়, আমাদের সমাজের অনেকেই এখনো বুঝতে পারেননি যে সহিষ্ণুতা কেবল একটি খালি শব্দ নয়, বরং এটি একটি জীবনধারা। এই জীবনধারা গ্রহণ করাটা কোনো সহজ কাজ নয়, বিশেষ করে যখন চারপাশে এত উগ্রবাদী ধারণা ভেসে বেড়ায়। কিন্তু আমরা যদি আমাদের সন্তানদের এই মূল্যবোধ শেখাতে পারি, তাহলে হয়তো আগামী প্রজন্ম এমন সহিংসতা দেখে বড় হবে না।

এমন পরিস্থিতিতে, আমাদের সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা, দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার এবং বিচার নিশ্চিত করা, এবং আক্রান্তদের সহায়তা প্রদান করা এগুলো আমাদের সরকারের কর্তব্য। একই সাথে, সামাজিক আন্দোলন, গণমাধ্যম এবং শিক্ষাব্যবস্থাও এ ব্যাপারে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। মিডিয়া যদি সঠিকভাবে এই ধরনের ঘটনা সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশ করে এবং শিক্ষাব্যবস্থা যদি আরও সহিষ্ণুতার শিক্ষা দেয়, তাহলে হয়তো আমরা সেই বিভেদকে মুছে দিতে পারবো।

আমার মনে হয়, এই ধরনের ঘটনা আমাদের একটি শিক্ষা দেয়। আমরা যদি এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আমাদের সমাজে আরও সম্প্রীতি সৃষ্টি করতে পারি, তাহলে হয়তো আমরা একটি আরও সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে পারবো। মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশটি সব ধর্ম, বর্ণ, সংস্কৃতির মানুষের মিলিত প্রচেষ্টার ফল। এই ধরনের সহিংসতা সেই মেলবন্ধনের উপর আঘাত হানে। তাই, সময় এসেছে আমাদের একত্র হয়ে দাঁড়ানোর।

শেষ পর্যন্ত, আমাদের প্রত্যেকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি নিজ নিজ স্থান থেকে দাঁড়িয়ে এই ধরনের সহিংসতার প্রতিবাদ করি, সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে পারি, তাহলে হয়তো আগামী প্রজন্ম একটি আরও সুন্দর, সহিষ্ণু, এবং সম্মিলিত বাংলাদেশ পাবে। আর সেই বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব আমাদের সবার। কি মনে হয়, আমরা কি পারব সেই পরিবর্তনের অংশ হতে?

By purnima