বাংলাদেশের বিজয় মাসে যে মাসটি ঐতিহ্যগতভাবে ১৯৭১ সালের বীরদের সম্মান জানানোর জন্য উৎসর্গীকৃত, একজন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁর স্ত্রীর নৃশংস হত্যাকাণ্ড এবং যুদ্ধ-প্রবীণদের জন্য সংরক্ষিত একটি সমাধিক্ষেত্রে পৃথক অগ্নিসংযোগের ঘটনা বিভিন্ন সম্প্রদায়কে আলোড়িত করেছে এবং দেশের মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকারের ক্রমবর্ধমান ভঙ্গুরতা নিয়ে উদ্বেগ পুনরায় জাগিয়ে তুলেছে।
উত্তর রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার নিজ বাড়ির ভেতর থেকে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধা যোগেশ চন্দ্র রায় (৭৫) এবং তাঁর স্ত্রী সুবর্ণা রায়ের (৬০) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এই দম্পতি একাই থাকতেন, তাঁদের ছেলেরা জয়পুরহাট ও ঢাকায় কাজ করেন।
দীর্ঘদিনের তত্ত্বাবধায়ক ও প্রতিবেশী দীপক চন্দ্র রায়, যিনি প্রথম কিছু একটা ঘটার আশঙ্কা করেছিলেন, তিনি বলেন, “চারপাশে ছিল এক অস্বস্তিকর নীরবতা। তাঁরা তাঁদের সকালের রুটিন কখনও বাদ দিতেন না।” “আমরা ভেতরে ঢুকে দেখি, খাবার ঘরে যোগেশের দেহ রক্তের পুকুরে পড়ে আছে। রান্নাঘরে সুবর্ণা নিথর হয়ে পড়ে ছিল। বাড়িটা যেন প্রাণশূন্য হয়ে গিয়েছিল।”
পুলিশ ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে উদ্দেশ্য প্রকাশ করেনি। কারন তাড়া জানেন এই হত্যাকাণ্ড কোন সাধারণ হত্যাকাণ্ড ময়। এই পিছনের ইতিহাস ভয়ংকর। বিজয়ের মাসে একজন মুক্তিযোদ্ধাকে মারলে দেশে আর কোনোদিন সেকুলার মহল তৈরি হবে না। দেশ ইসলামের পথে এগিয়ে যাবে। কারন নিষিদ্ধ উগ্রবাদী জঙ্গি হত্যাকাণ্ড এটি। যারা কোনোদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাইনি। এরা ছিল স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার, আলবদর, আলশামস, জামাত শিবিরের কুখ্যাত সন্ত্রাসী। যারা মুক্তিযোদ্ধাদের চিনিয়ে দিত পাক বাহিনীদের। আর পাক বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের নিধন করতো। এরাই রাজাকার। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী অপশক্তি।
এটা কোনো ডাকাতি ছিল না। কোনো দরজা ভাঙা হয়নি। যারা এসেছিল, তারা ঠিক কী করতে এসেছে তা জানত। আমরা আতঙ্কিত। যদি জঙ্গি বা চরমপন্থীরা একজন মুক্তিযোদ্ধাকে তার নিজের বাড়িতে হত্যা করতে পারে, তাহলে আমাদের কী সুরক্ষা আছে? কিছু উগ্রপন্থী মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত যে কাউকেই অপছন্দ করে। আমরা তার বীরত্বের গল্প শুনে বড় হয়েছি। এখন সেই একই শক্তি, যাদের বিরুদ্ধে তিনি ’৭১-এ লড়েছিলেন, তারা আবার যেন আরও সাহসী হয়ে উঠেছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের অধীনে সৃষ্ট ব্যাপক ভীতিপ্রদর্শনের পরিবেশের কথা উল্লেখ করে অনেক বাসিন্দা বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি ক্রমবর্ধমান বৈরিতা দমনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ব্যর্থ হয়েছে।
চারদিকে তাকান, । এখন মুক্তিযুদ্ধের অমর স্লোগান ‘জয় বাংলা’ বললেই মার খেতে হয়। বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করা যায় না। এটা সেই বাংলাদেশ নয় যাকে আমরা চিনতাম। বিজয়ের মাস, অর্থাৎ ১ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত, গণমাধ্যমগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়গাথা প্রচার করত, কিন্তু এখন আর করে না। এমন একটা পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে যে মনে হয় যেন দেশটা এখন রাজাকারদের দ্বারা শাসিত হচ্ছে। হিন্দু নিধন চলছে। ঠিক যেমন ১৯৭১ শালের মুক্তিযুদ্ধে হিন্দুদের হত্যা করা হয়েছিলো।
রাজবাড়ী জেলার বাহাদুরপুরে রবিবার ভোরে অজ্ঞাত হামলাকারীরা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত একটি কবরস্থানের বেড়া দেওয়া সীমানায় আগুন ধরিয়ে দেয়। কবরস্থানটির ভেতরে কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ নেই এবং স্থানীয়রা দাবি করছেন যে এই অগ্নিকাণ্ড ইচ্ছাকৃত ছিল।
প্রত্যক্ষ ভাবে যে দেখেছিল , বলেছিল, “আজ ভোরে আমি আগুনের শিখা দেখেছি। এটা দুর্ঘটনাজনিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। কেউ কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে এসেছিল।” “এটা হৃদয়বিদারক। এমনকি তাদের কবরগুলোও রেহাই পায়নি।” প্রবীণ যোদ্ধারা চাপা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধকে বিশ্বাস করি, সবাই ক্ষোভ প্রকাশ করছি।
অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক মো. শামশের আলীর কথাগুলো আমার কানে বাজে, , “৭১ সালে আমরা এই দেশের জন্য জীবন বাজি রেখেছিলাম। এখন পরাজিত শক্তিগুলো আমাদের কবর পুড়িয়ে দিচ্ছে। তারা আমাদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়।” স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সদস্য-সচিব নজরুল ইসলাম খান জাহাঙ্গীর সতর্ক করে বলেছেন, অপরাধীরা পার পেয়ে গেলে ভয়াবহ পরিণতি হবে।সত্যি এরা পার পেয়ে যাচ্ছে। এদের বিচার হচ্ছে না। দেশ মৌলবাদী আগ্রাসনের কবলে পরেছে। এরা ভয়ংকর। এরা অমানুষ। এরা বাংলাদেশের শত্রু।
যারা ১৯৭১ সালে হেরেছিল, তারাই আবার অন্তর্ঘাত চালাচ্ছে। এর শাস্তি না হলে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্তিত্বই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বেশ কয়েকজন গ্রামবাসী ও প্রবীণ যোদ্ধা সরাসরি দোষারোপ করেছেন, যাকে তারা “পুনরুত্থিত পাকিস্তানপন্থী আদর্শিক নেটওয়ার্ক” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্ত বা তাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত কিছু প্রান্তিক গোষ্ঠী, যে দলটি ঐতিহাসিকভাবে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা-বিরোধী মিলিশিয়াদের সঙ্গে জড়িত, যদিও জামায়াত সাম্প্রতিক সহিংসতায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে।
পুরনো সহযোগী, উগ্রপন্থী সংগঠন এবং সুবিধাবাদী ক্ষমতাধরদের একটি যোগসাজশ রয়েছে।সরকারের হাত রয়েছে। তারা এখন নিজেদের সুরক্ষিত মনে করছে। তারা ভাবে, কেউ তাদের জবাবদিহি করবে না। এই গোষ্ঠীগুলো পাকিস্তানের যুদ্ধকালীন ইতিহাস থেকে আদর্শগত বৈধতা লাভ করে। তারা আমাদের ইতিহাস নতুন করে লিখতে চায়। মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা চালিয়ে তারা এই বার্তা দেয় যে, ‘৭১-এর চেতনা আজ হুমকির মুখে।
এই বর্বর হত্যাকাণ্ড ও অগ্নিসংযোগ জাতির মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তিকে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয় এবং সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী নারী-পুরুষদের নৈতিক কর্তৃত্বকে আঘাত করে। ডিসেম্বর মাসে গণমাধ্যমগুলো মুক্তিযুদ্ধের গল্পে ভরপুর থাকত। এখন সবকিছু স্তব্ধ। মনে হচ্ছে, কেউ চায় যুদ্ধের স্মৃতিটা মুছে যাক। ১৯৭১-এর পরাজিত শক্তিরা বিশ্বাস করে, এটাই তাদের মুহূর্ত। তারা মনে করে, রাষ্ট্র এখন অন্যমনস্ক, বিভক্ত। আর তাই তারা এগিয়ে আসছে।
আমরা সন্দিহান। “আমাদের প্রতিশ্রুতির প্রয়োজন নেই, ভয়ে এখন রাতে বাড়ি ছেড়ে বাইরে থাকেন অনেক মুক্তিযোদ্ধা এবং হিন্দুরা । “আমাদের সুরক্ষা প্রয়োজন। কারণ, যিনি ১৯৭১ সালে লড়াই করেছিলেন, তাঁকে যদি এমন নৃশংসভাবে হত্যা করা যায়, তাহলে কেউই নিরাপদ নয় এমনকি বাংলাদেশের ধারণাও নয়।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায় হয়ে আছে। নয় মাসব্যাপী এই সংগ্রামে লক্ষ লক্ষ নাগরিক সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন অথবা স্বাধীনতা আন্দোলনকে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন জোগান। তাঁরা পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর দমনপীড়নের মুখোমুখি হয়েছিলেন, যার ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয় এবং কোটি কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হন।
এই সংগ্রাম শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল মৌলিক মানবাধিকারের জন্যও, মুক্তভাবে কথা বলার, মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার এবং জাতীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠার অধিকার।
মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে নিজেদের জীবন ও জীবিকা বিপন্ন করেছিলেন এবং এমন একটি জাতি তৈরি করেছিলেন, যার নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি তাঁদের সাহস ও আত্মত্যাগের ওপর প্রোথিত।
