বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে, যখন খবরের কাগজ খুললেই চোখের সামনে ভাসে দেশে বাড়তে থাকা বেকারত্বের হার, দুর্নীতি আর অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশের চিত্র, তখন একটা কথা খুব পরিচিত হয়ে উঠেছে ‘ভাগনে, তুই ভারত চলে যা’। একসময় যখন উচ্চশিক্ষা বা উন্নত চাকরির আশায় মানুষ বিদেশে যাওয়ার কথা চিন্তা করত, তখন তাদের চোখে ভাসত পশ্চিমা দেশগুলোর চিত্র। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রেই ভারত হয়ে ওঠেছে তাদের প্রথম পছন্দ।

কেন এধরনের কথাবার্তা এখন প্রায়শই শোনা যায়? এর মূল কারণ খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে একটু বিশ্লেষণ করতে। এমন নয় যে আমাদের দেশে প্রতিভার অভাব আছে বা মানুষ কাজ করতে চায় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে সুযোগের অভাব, যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়নের অভাবে মানুষ হতাশ হয়ে পড়ছে। আর এ হতাশা থেকেই উঠে আসে আত্মীয়-পরিজনের মুখ দিয়ে এমন পরামর্শ।

‘ভাগনে, তুই ভারত চলে যা’ এই কথাটা শুনলে প্রথমে হয়তো হাসি পাবে। কিন্তু একটু ভাবলেই বোঝা যায় এর পেছনের বাস্তব চিত্র। ভারত আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ, ভাষার সাদৃশ্য আছে, সংস্কৃতিতেও মিল আছে অনেক। এই কারণে সাংস্কৃতিক হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনাও কম। আর ভারত সরকারও বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশীদের জন্য বিভিন্ন স্কলারশিপের ব্যবস্থা করে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য একটা বড় সুযোগ।

তবে কথা হলো, কেন এত লোক দেশ ছেড়ে যেতে চায় বা আত্মীয়-স্বজন এমন পরামর্শ দিতে থাকে? কাজের সুযোগ বলতে গেলে বড় শহরগুলোতেই সীমাবদ্ধ। গ্রামের কথা তো বলাই বাহুল্য। আর এই কারণেই বাংলাদেশের অনেক যুবক-যুবতী নিজের প্রাপ্য বা যোগ্য সম্মানটুকু পেতে চায় অন্য কোথাও। ভারত এ ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। উচ্চশিক্ষা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজের সুযোগও অনেক বিস্তৃত। ইঞ্জিনিয়ারিং, ডাক্তারি, ব্যবসা পরিচালনা, এমনকি ছোটখাটো নানা কাজের ক্ষেত্রেও ভারতে রয়েছে নানান সুযোগ।

আমার এক বন্ধু আছে, নাম তার রফিক। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাণিজ্যে স্নাতক করেছে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও সে কোনো ভালো চাকরি পায়নি। শেষে সে সিদ্ধান্ত নেয় ভারত যাওয়ার। কলকাতার একটি নামকরা প্রতিষ্ঠান থেকে MBA করতে চায়। তার মা-বাবাও তা নিয়ে বেশ উৎসাহী। কারণ তাদের বিশ্বাস, রফিক যদি একবার ভারতে গিয়ে সফল ক্যারিয়ার শুরু করতে পারে, তাহলে সেটাই হবে তার জীবনের মোড় ঘুরানোর সুযোগ।

এই বিশ্বাসের পেছনে একটা কারণ হলো, ভারতের মুদ্রামান ও বাজারে সস্তায় জীবনধারণ করা যায়। মানে, এক্ষেত্রে বেশিরভাগ বাংলাদেশীই মনে করে, ভারতে গিয়ে একটু কষ্ট করে একটু সাশ্রয়ী জীবন যাপন করলে হয়তো জীবনের মানোন্নয়ন সম্ভব। আর যদি সুযোগ আসে ইউরোপ বা আমেরিকার মতো কোথাও চলে যাওয়ার, তাহলে তো কথাই নেই।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। অনেকেই হয়তো এদেশের মায়া ত্যাগ করতে পারে না। তাদের জন্য ভারত যাওয়ার পরও একটা টানাপোড়েন চলতে থাকে। তাদের হয়তো মনে হয়, আমি যদি দেশে থেকেও কিছু করতে পারতাম! আর এভাবেই তাদের মন কখনো শান্ত হয় না।

আসলে, প্রতিটি মানুষেরই নিজের দেশ ছেড়ে যাওয়ার পেছনে কিছু না কিছু কারণ থাকে। কেউ হয়তো নিজের ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখে, কেউ আবার নিজের পরিবারের ভালো থাকার কথা ভাবে। কিন্তু দেশে সুযোগের অভাব, দুর্নীতি আর রাজনৈতিক অস্থিরতা অনেক সময় আমাদের প্রিয়জনদের মুখ দিয়ে এই ধরনের পরামর্শ দেওয়ার পথ তৈরি করে দেয়।

এখানে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, আমরা কি সত্যিই দেশ ছাড়ার পরামর্শ দিতে চাই? বিশ্বের কোথাও কি এমন দেশ আছে যেখানে সব কিছুই ঠিকঠাক আছে? আমাদের তো নিজেদের দেশকে ভালোবাসতে হবে এবং তার উন্নয়নে অংশীদার হতে হবে। তবে হ্যাঁ, নিজের জীবনের মানোন্নয়ন বা ক্যারিয়ারের উন্নয়ন যদি বিদেশে গিয়ে সম্ভব হয়, তাহলে সেটা একটা ভালো সুযোগও হতে পারে। তবে সেটা যেন সবসময়ই স্বল্পমেয়াদী সমাধান হিসেবে বিবেচিত হয়। আমরা চাই আমাদের দেশেই এমন সুযোগ তৈরি হোক।

অবশেষে, আমি মনে করি, ভারত যাওয়ার পরামর্শ দেওয়ার পেছনে আমরা যদি আমাদের দেশের সমস্যাগুলোকে নিয়ে চিন্তা করি এবং সেগুলো সমাধানে সবাই মিলে কাজ করি, তাহলে হয়তো একদিন আমাদের দেশই হয়ে উঠবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্য। ভাগনে, তুই ভারত চলে যা’ এই কথাটা একদিন আমাদের হাসি ফোটাবে, আর আমরা গর্ব করে বলব আমরাই উন্নত বাংলাদেশের নাগরিক।

By bithika