বৃষ্টি হালকা টাপুর টুপুর করছে, আর আমি বসে আছি আমার ছোট্ট বারান্দায়, এক কাপ গরম চা হাতে। খুলনা, বরিশাল, এবং রংপুরে জমি দখলের যে ঘটনা প্রায়শই শোনা যায়, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভাবছি। আপনারাও নিশ্চয়ই শুনেছেন, খবরের কাগজে বা টেলিভিশনের স্ক্রিনে। তবে এই ঘটনা শুধু খবরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, যেন একটা নীরব যুদ্ধে রূপ নিচ্ছে। এই যুদ্ধের শিকার হয়ে যাচ্ছে অনেক নিরীহ মানুষ, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন।
খুলনা, বরিশাল আর রংপুর এই তিনটি অঞ্চল যেন ভূমি দখলের ‘হটস্পট’। যারা এসব জায়গায় গিয়েছেন বা এখানকার খবর রেখেছেন, তারা জানেন যে, এখানে জমি দখলের ঘটনা কোনো নতুন বিষয় নয়। তবে সম্প্রতি এর তীব্রতা যেভাবে বেড়েছে, তা সত্যিই উদ্বেগজনক। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জমি দখলের ঘটনা যেন এক নীরব যুদ্ধের চেহারা নিয়েছে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এ ধরনের ঘটনা আমাদের সামাজিক বন্দোবস্তের ওপর প্রভাব ফেলছে। একটা সময় ছিল যখন প্রতিবেশীদের মধ্যে আন্তরিক সম্পর্ক ছিল, সবাই মিলে একে অপরের পাশে দাঁড়াতাম। কিন্তু এখন যেন সেসব সম্পর্কের জায়গায় অবিশ্বাস আর ভয় পেয়ে বসেছে। এবং এই ভয়ের মূলে রয়েছে মুষ্টিমেয় কিছু লোক যারা নিজেদের স্বার্থের জন্য অন্যের জমি দখল করে নিচ্ছে।
আমাদের দেশের ইতিহাস দেখলে দেখা যায়, জমি দখল বা হাতবদলের ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে কোন বিষয়টি উদ্বেগের যেটা আমাদের গভীরভাবে ভাবাতে বাধ্য করে, তা হলো এই ঘটনা সাম্প্রদায়িক রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে। একবার ভাবুন তো, যার জমির ওপর নির্ভর করে চলে তার পরিবার, সেই জমি যদি হঠাৎ করে দখল হয়ে যায়, তাহলে তার মনের অবস্থা কেমন হয়। এ এক অসহায়ত্ব, যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
যারা এই জমি দখলের হোতা, তারা বেশিরভাগ সময়ই প্রভাবশালী এবং ক্ষমতাবান ব্যক্তি বা গোষ্ঠী। এদের বিরুদ্ধে কথা বলা যেন নিজেদের বিপদ ডেকে আনার শামিল। কিন্তু তবুও কিছু মানুষ আছেন যারা সাহস করে এগিয়ে আসেন, নিজের অধিকার রক্ষার জন্য লড়াই করেন। তবে এই লড়াই যে কতটা কঠিন, তা বাইরে থেকে বোঝা কঠিন। প্রায়শই এদেরকে নানারকম হয়রানি সহ্য করতে হয়। আইনগতভাবে লড়াই করতেও অনেক সময় লাগে এবং ততদিনে অনেক ক্ষতি হয়ে যায়।
এই পরিস্থিতির আরেকটি দিক হলো, অনেক সময় জমি দখলের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও থাকে। কেউ যখন রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবে হয়ে ওঠে, তখন তার পক্ষে এই ধরনের অনৈতিক কাজ সম্পন্ন করা সহজ হয়ে যায়। এবং সমাজের একটি বৃহৎ অংশ যখন এসব কর্মকাণ্ড নীরবে সহ্য করে, তখন এই ধরনের অন্যায় আরও বিকট হয়ে ওঠে।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী? প্রথমে আমাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। আমরা যদি নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হই, তবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস পাব। এছাড়া আইনের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এখানে কর্তৃপক্ষের দায়িত্বও অনেক। তাদের উচিত হবে সমানভাবে বিচার করা এবং জমি দখলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। তবে শুধুমাত্র আইন প্রয়োগ করলেই হবে না, আমাদের সামাজিক চেতনা বাড়াতে হবে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এই নীরব যুদ্ধ আমাদের সামাজিক কাঠামোর ওপর বিশাল প্রভাব ফেলছে। যদি আমরা এটা রুখতে না পারি, তাহলে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য এক কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক, সমাজের শান্তি এবং স্থিতিশীলতা সবই ঝুঁকির মুখে পড়বে।
এই সমস্যার সমাধান কি শুধুমাত্র সরকারের দায়িত্ব? নাকি আমাদেরও কিছু করতে হবে? যদি আমরা প্রত্যেকে আমাদের আশেপাশের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াই, তাহলে হয়তো আমরা এই যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারব। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন সাহস, সচেতনতা এবং ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা। কী বলবেন? আপনার মতামত জানালে খুশি হব।
