বাড়ি দখল, কাগজে বানানো বিক্রয় চুক্তি, থানায় ম্যানেজ: সংখ্যালঘুদের জমি বাঁচাতে রাত–দিন লড়াই
কী ভেবে বলুন তো, একজন মানুষ যেখানে শান্তিতে মাথা গুঁজে রাত কাটাতে পারে না, সেখানে তার জীবনের মানে কী? বস্তুত, আমরা অনেকেই এসব বিষয় নিয়ে খুব একটা ভাবি না, কারণ আমাদের মাথার ওপর একটি ছাদ আছে, জমি আছে। কিন্তু আমাদের দেশের সংখ্যালঘু মানুষদের অনেকেরই এই মৌলিক অধিকার সুখস্বপ্নের মতো। বাড়ি দখল, কাগজে বানানো বিক্রয় চুক্তি, থানায় ম্যানেজ এই সব শব্দ প্রেক্ষাপট পরিবর্তন করতে পারে, এবং এর শিকার হতে পারে কোনো নিরপরাধ পরিবার। আজ আমরা কথা বলবো এমন এক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে, যেখানে সংখ্যালঘুরা রাত-দিন লড়াই করছে তাঁদের জমি বাঁচাতে।
আমরা জানি, আমাদের দেশে অনেক বছর ধরেই জমি দখলের প্রবণতা রয়েছে। তবে সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে এটি যেন আরও ভয়ানক। এমনকি, তাঁরা অনেক সময় ন্যায়বিচার পেতে ব্যর্থ হন। কারণ, জমির কাগজ পত্র আসলে একটা খুবই জটিল বিষয়। যখন কোনো খাস জমি বা পুরোনো জমির কথা আসে, সেখানে কোনটা আসল আর কোনটা নয়, তা বোঝা মুশকিল। অনেকে সুযোগের সন্ধানী মানুষ এই সুযোগ নেন এবং বানানো কাগজে জমির দখল দাবি করেন। আর পুলিশ স্টেশনে গিয়ে অভিযোগ করা মানে নতুন এক যুদ্ধের শুরু। থানায় ম্যানেজ শব্দটি যেন আমাদের দেশের একটা বাস্তবতা বয়ে আনছে। কী মানে বোঝাতে চাইছি? অর্থাৎ ভালো করে খেয়াল করলে দেখতে পাবেন, থানায় গিয়ে অভিযোগ করলেই সব সমাধান হয় না। বরং, সেখানে অনেক সময় বিভিন্ন উপায়ে অভিযোগকারীর বিপক্ষে কাজ হয়ে যায়।
আমার দেখা এমন অনেক ঘটনা আছে যেখানে সংখ্যালঘু মানুষরা নিজেদের সম্পত্তি রক্ষায় রাতদিন লড়াই করে যাচ্ছেন। একটি ঘটনা মনে পড়ে রাজশাহীর এক গ্রামে এক সংখ্যালঘু পরিবার, যাদের পুরো জীবনের সঞ্চয় দিয়ে কেনা ছোট্ট একটি জায়গা, সেটি দখল হয়ে যায়। প্রথমে তাঁরা ভাবলেন বিষয়টি মিটমাট হয়ে যাবে। কিন্তু যখন বুঝলেন যে এটি আদৌ সহজ হবে না, তখন তাঁদের প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে উঠলো এক অপরিসীম লড়াই।
তবে এই লড়াই শুধু আদালত বা থানার দ্বারস্থ হয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক সময় জায়গার দখল নিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে জীবনের জন্য ভয় করাটাই স্বাভাবিক। প্রাণের ভয়, সামাজিক অপমান এবং হুমকির মধ্যে তাঁরা সংগ্রাম চালিয়ে যান। এর মধ্যে কিছু মানুষ আছেন যারা সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমাধান খোঁজেন। অবশ্যই এটি কোনো সহজ পথ নয়, কারণ অনেক সময় এই প্রক্রিয়ায়ও দুর্নীতি বা অনিয়মের শিকার হতে হয়।
আমার বন্ধুদের মধ্যে একজন, যিনি সামাজিক কাজে নিবেদিত, তিনি প্রায়ই এসব বিষয়ে কাজ করেন। তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে জানতে পারি, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সংখ্যালঘুদের সাথে এমন আচরণ করা হয় যেন তাঁরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। তাঁদের সম্পত্তি, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সবকিছুই যেন কোনো মুল্য রাখে না। অথচ সংবিধান অনুযায়ী, তাঁরা সমান অধিকার ভোগ করার কথা।
এখন প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী? এটা সত্য যে, একা কোন ব্যক্তির পক্ষেই কিছু করা সম্ভব নয়। তবে সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে আমরা অনেক কিছুই করতে পারি। সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষণে আমাদের সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং জমির অধিকার সংক্রান্ত জটিলতা সমাধানে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই সমস্যা সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা যেতে পারে। গণমাধ্যমেরও এ ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করার দায়িত্ব রয়েছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের নিজেদের মধ্যে সংস্কার ঘটাতে হবে। জমিতে দখলদারের লোভ না রাখার শিক্ষা আমাদের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
আমাদের যেসব আইন রয়েছে, সেটি শক্তভাবে বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিতে হবে। পুলিশ প্রশাসন এবং আদালতের প্রতি আমাদের অতিরিক্ত আস্থা রাখা উচিত নয়, বরং নিজেদের মতের প্রতি সঠিকভাবে অনুগত থাকতে হবে। একে অপরের পাশে দাঁড়ানো, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাঁদের জমি অধিকার রক্ষায় সক্রিয় হওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
অবশেষে বলতে চাই, আমাদের উচিত এই ধরনের সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া। কারণ এ ধরনের সমস্যা শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের নয়, বরং এটি পুরো সমাজের সমস্যা। আমরা যদি তাদের পাশে না দাঁড়াই, তবে আমাদের সমাজের কোন অংশই নিরাপদ থাকবে না। তাই প্রশ্ন থেকেই যায় আমরা কি দাঁড়াবো না তাঁদের পাশে, যারা আজো জমির অধিকার বাঁচানোর জন্য রাত–দিন লড়াই করছে?
