আমাদের সমাজে ধর্মীয় সহাবস্থান যেন এক অপূর্ব সৌন্দর্যের প্রতিচ্ছবি। যদিও এ চিত্রটা কোনো কোনো সময়ে মলিন হয়ে যায়, তবুও কখনও কখনও এই সৌন্দর্যের গন্ধই আমাদের আশার আলো দেখায়। বাংলাদেশে মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মিলিত সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তবে, সম্প্রতি একটি ঘটনায় মনটা বেশ নাড়া খেল। এটা এমন একটা ঘটনা, যা বাইরে থেকে দেখলে খুব সুন্দর মনে হবে, কিন্তু ভেতরের অনুভূতি ছিল একেবারে বিপরীত।
মন্ডপে মুসলিম স্বেচ্ছাসেবক যুবকের গল্পটা শুরু হয়েছিল দুর্গাপূজার আয়োজনে। এই যুবক, তার নাম আমরা এখানকার সুবিধার্থে রাসেল বলেই ধরা যাক, সে বরাবরই সব ধর্মের প্রতি সমান শ্রদ্ধাশীল। স্কুলজীবন থেকে তার বন্ধুরা ছিল বিভিন্ন সম্প্রদায়ের। তবে, দুর্গাপূজার সময়ে সে সবসময় তার হিন্দু বন্ধুদের পাশে দাঁড়াত, মন্ডপ সাজানো থেকে শুরু করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পর্যন্ত সব কাজে। রাসেলের কাছে এ কাজগুলো একধরনের সামাজিক দায়িত্ব পালন। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে তার অভিজ্ঞতা তাকে নানা ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
অবশ্যই, প্রথমবার যখন রাসেল একটি পূজা মন্ডপে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে শুরু করেছিল, উৎসবের এলাকায় অনেকেই অবাক হয়েছিল। কিছু মানুষের মনে সেই অবাক হওয়া সেখানেই থেমে যায়নি, বরং তারা তাকে বিভিন্নভাবে অপমান করতে শুরু করলো। কেউ কেউ বলেছিল, “তুমি মুসলিম হয়ে কেন হিন্দুদের কাজে সহায়তা করছ?” অন্যদিকে অনেক হিন্দু মুরুব্বি তার কাছে সরাসরিই বলেছিল, “তোমাদের ওখানে তো আমাদের ঢোকা বন্ধ।” রাসেলের কাছে এই কথা গুলো ছিল গভীর অপমানের। কিন্তু সে বুঝতে পেরেছিল, এটাই তার আসল লড়াই।
এই লড়াইটা শুধু রাসেলের একার নয়। এটি আমাদের সবার লড়াই। আমরা যারা বিশ্বাস করি মানবতার ধর্ম সবচেয়ে বড় ধর্ম, তাদের সবার। রাসেল সেই লড়াইটার সম্মুখ যোদ্ধা। তার কাজের গভীর মূল্যায়ন না করলেও সে জানে যে একজনের ছোট্ট প্রয়াসই অনেক বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। রাসেল জানে, সে যখন প্রতিদিন হাসিমুখে মন্ডপেই কাজ করতে যায়, তখন অনেকেই তার কাজের প্রশংসা করে। কিন্তু সেই প্রশংসার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে অনেকের সন্দেহ আর অবিশ্বাস।
এই দ্বৈত মানসিকতা আমাদের সমাজে বড় একটি সমস্যা। একদিকে আমরা সবাইকে একত্রিত হতে বলি, অন্যদিকে আমাদের মনের গভীরে লুকিয়ে থাকে বিভেদের বীজ। রাসেলের মতো যুবকদের জন্য এই ধরনের পরিস্থিতি সহজ নয়। তারা কখনও কখনও নিজেকে প্রশ্ন করে, “এটা কি সত্যিই মূল্যবান?” কিন্তু তারপরেও তারা থেমে থাকে না। কারণ তাদের বিশ্বাস, মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ছড়াতে তারা সফল হবে।
রাসেলের গল্পটি আমাদের উপর একটি বড় দায়িত্ব দেয়। আমাদের চিন্তা-ভাবনা ও আচরণে পরিবর্তন আনা জরুরি। আমাদের প্রতিটি কর্মে মানবতার সেবা করা উচিত, তাতে কোনো ধর্মের সীমা থাকা উচিত নয়। হয়তো রাসেল একদিন সমাজের এই অব্যক্ত অপমানবোধকে পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারবে না, কিন্তু তার প্রতিটি চেষ্টায় সে সমাজের জন্য এক নতুন উদাহরণ সৃষ্টি করে চলেছে।
এই গল্পটি আমাদের শেখায়, শুধুমাত্র ধর্মের দোহাই দিয়ে কাউকে বিচার করাটা ঠিক নয়। বরং আমাদের উচিত মানুষের কাজ দেখে তার মূল্যায়ন করা। রাসেলরা আমাদের সমাজের তারা, যারা আমাদের দেখায় ভালোবাসার রাস্তা। তাদের থেকে আমরা শিখি কিভাবে নানা অপমান আর অবজ্ঞার মাঝেও মানবতার আলো জ্বালিয়ে রাখা যায়।
এখন প্রশ্নটা আমাদের নিজের কাছে। আমরা কি আসলেই রাসেলের সেই প্রচেষ্টাকে গুরুত্ব দিচ্ছি? আমরা কি আসলেই তার মতো সাহসী হতে পারব? যদি না পারি, তবে আমাদের নিজেদের মূল্যায়ন করাটা জরুরি। এমন কি দিন আসবে যখন আমাদের সমাজে এমন কোনো বিভেদ বা অস্বস্তির অনুভূতি থাকবে না? যখন সত্যিই আমরা মানবতাকে ধর্মের ওপরে স্থান দিতে পারব? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে হয়তো রাতের ঘুম হারাম হতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের উচিত চেষ্টা করে যাওয়া, কারণ আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
