শিরোনামটা পড়েই মনে হলো, এ যেন একটা দুঃস্বপ্নের গল্প। যদিও আমরা জানি, এটা কোনো কল্পকাহিনী নয়, বরং খুবই বাস্তব একটি প্রেক্ষাপট। “করোনার আগে শেষ মিছিল: ফেব্রুয়ারিতে সংখ্যালঘু দোকান–বাড়িতে টার্গেটেড হামলা” কথাগুলো পড়তে পড়তেই মনে হচ্ছিল, এ শুধু গল্প নয়, আমাদের সমাজের একটা করুণ অধ্যায়।
ফেব্রুয়ারি মাস, বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে আমাদের বাংলাদেশে। সবুজ শ্যামলিমার মধ্যে নতুন ফুলের ঘ্রাণ, পাখির কূজন, এ সবই যেন আমাদের একটা নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই মাসে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার জন্য সেটা আমাদের স্মৃতিতে একটা কালো দাগ রেখে গেছে। বিশেষত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য। এটা এমন এক সময় ছিল যখন পুরো পৃথিবী করোনা ভাইরাসের প্রভাবের মুখোমুখি হচ্ছিল। কিন্তু আমাদের দেশের কিছু মানুষ তখনও ব্যস্ত ছিল ঘৃণা ও সহিংসতায়।
ফেব্রুয়ারি মাসের সেই দিনের কথা ভাবলে এখনও বুকটা কেঁপে ওঠে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দোকান, বাড়িগুলোতে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে হামলা করা হয়েছিল। এটা যেন কোনো ব্যাক্তিগত রাগ বা প্রতিশোধের ঘটনা নয়, বরং একটি সমষ্টিগত হুমকি। আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে যারা অন্যের ধর্ম, সংস্কৃতি বা জাতিগত পরিচয়কে সম্মান করতে জানে না। তাদের কাছে সংখ্যালঘুদের অস্তিত্ব যেন সহ্য হয় না। আর তাই তারা পরিকল্পিতভাবে তাদের টার্গেট করে। এই বিষয়টি গভীরভাবে কষ্ট দেয়।
এমন সময়ে, সবার মনে প্রশ্ন জাগে, কতদিন আমরা এমন পরিস্থিতি সহ্য করবো? আমাদের দেশ তো অনেক আগেই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয়েছে, তারপরও কেন আমরা এতো অসহিষ্ণু? কেন আমাদের সমাজে এখনও এই ধরনের বিদ্বেষমূলক আক্রমণ ঘটে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি আমরা নিজেরা খুঁজতে না পারি, তাহলে হয়তো আমাদের আগামী প্রজন্মও এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হবে।
আমার ছোটবেলার স্মৃতিতে, পাড়ার মোড়ের যে দোকানটা ছিল, সেটা চালাতেন একজন সংখ্যালঘু ব্যবসায়ী। তার সাথে আমাদের পরিবারের কিছুটা সাধারণ পরিচয় ছিল। প্রতিদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে আমি তার দোকানে যেতাম চকোলেট কিনতে। আজ এত বছর পরেও, যখন কোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার কথা শুনি, সেই দোকানদার চাচার মুখ মনে পড়ে যায়। ভাবি, ঠিক কি এমন ভুল ছিল তার, যে শুধু তার ধর্মের জন্য এমন শাস্তি পেতে হবে?
কিন্তু এই প্রসঙ্গটা শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বা আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটা আমাদের দেশের একটি বৃহত্তর সামাজিক সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। আমরা যখন থেকেই ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়ের কারণে কাউকে বিচার করতে শুরু করেছি, তখন থেকেই আমরা আমাদের মানবিকতা হারিয়েছি। এসব সমস্যার সমাধান খুঁজতে হলে আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে, পরিবারে এবং সামাজিক পর্যায়ে এই ধরনের বিদ্বেষ ও সহিংসতা প্রতিরোধে শিক্ষা দিতে হবে।
একটা বিষয় বারবার মনে হয়, আমাদের সমাজে যেখানে এত রকমের সমস্যা, সেখানে কেন আমরা একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে পারি না? সব ধর্মের মূল কথা হলো শান্তি এবং ভালোবাসা। আমরা যদি নিজেদের মধ্যে এই শিক্ষা বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে হয়তো একদিন এই সমস্যাগুলো অতিক্রম করতে সক্ষম হবো।
আমাদের দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অবদান কি কম? তারা দেশের মানুষের মতই সেবা দেন, দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখেন। তবু কেন তাদের এমন অত্যাচার সহ্য করতে হয়? আমাদের সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, এবং সমাজের সকল স্তরের মানুষ যদি এই সমস্যার প্রতি গুরুত্ব দেয়, তাহলে হয়তো আমরা একদিন এই সমস্যার সমাধান করতে পারবো।
তবে কেবল শাসন বা আইন দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন মনোভাবের পরিবর্তন। আমাদের করতে হবে একত্রিত প্রয়াস, যেখানে শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা এবং সহিষ্ণুতা বৃদ্ধি করা যায়। আমাদের স্কুলগুলোতে যাতে শিশুদের মধ্যে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা এবং আচার আচরণের শিক্ষা দেয়া হয়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।
এই লেখাটা লিখতে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে, আমাদের এই ছোট্ট বাংলাদেশ এত রকমের সৌন্দর্যে ভরপুর, কেন আমরা আরও কিছু সৌন্দর্য যোগ করতে পারি না? কেন আমরা আমাদের সমাজকে, আমাদের দেশের বিন্যাসকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারি না? আমাদের সমাজে এমন কিছু কুসংস্কার আছে যা আমাদের ভালোর দিকে এগোতে বাঁধা দেয়। তাই আমি চাই, আমরা সবাই একত্রিত হয়ে এমন একটি সমাজ গড়ি যেখানে কোনো ধরনের বিদ্বেষ নেই, যেখানে মানুষকে তার ধর্ম, জাতিগত পরিচয় বা মতামতের জন্য আক্রমণ করা হয় না।
এই ঘটনাগুলো আমাদের সমাজের একটি বাস্তবতা হলেও, আমরা যদি নিজেরা সচেতন হয়ে কাজ করতে শুরু করি, তাহলে দিনবদলের আশা করতেই পারি। আমাদের নিজেদের মধ্যে সেই পরিবর্তন আনতে হবে, যেটা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি ভালো পৃথিবী রেখে যাবে।
সত্যিই, একদিন আমরা একটা এমন সময় পাবো, যখন এইসব প্রশ্ন আর কোনো অর্থ বহন করবে না। কিন্তু সেই সময়টা কবে আসবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
