বছর শেষে হিসাব: কত মন্দিরে হামলা, কত ঘর পুড়ল, কত পরিবার দেশ ছাড়ল
আমাদের দেশে বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা মনকে দুঃখিত করে দেয়। বিশেষ করে, যখন সামাজিক ও ধর্মীয় বিভিন্ন কারণে সংঘাত ঘটে, তখন এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তার প্রভাব পড়ে গোটা সমাজে। গত কয়েক বছরের কিছু ঘটনা অনুমান করতে সাহায্য করে, বছরের শেষ দিকে বিভিন্ন প্রতিবেদন দেখলে আমরা দেখতে পাই যে, বছরের শুরু থেকে নানা রকম হামলা, ঘর পুড়ানো এবং পরিবারদের দেশ ছাড়ার ঘটনা ঘটে চলেছে। এইসব ঘটনা শুধু যে নির্দিষ্ট পরিবারের ক্ষতি করে, তা নয়, বরং আমাদের জাতীয় পরিচয় এবং সামাজিক সম্প্রীতিকেও বিপন্ন করে তোলে।
আমরা যদি ২০২০ সালের দিকে তাকাই, দেখতে পাবো যে, এই বছর অনেক গুলো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গিয়েছিল। বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হামলা নতুন কিছু নয়, তবে প্রতিটি নতুন হামলা আমাদের পুনরায় চিন্তা করতে বাধ্য করে, আমরা কি আসলেই একটি শান্তিপূর্ণ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে ভরা সমাজে বাস করছি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে হলে আমাদের একটু পেছন দিকে ফিরে তাকাতে হবে এবং এই ধরনের হামলা ও নির্যাতনের পিছনে থাকা মূল কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে।
২০২০ সালের একাধিক ঘটনার দিকে নজর দিলে দেখা যাবে যে, সারা বছরজুড়ে দেশে বিভিন্ন মন্দিরে হামলা হয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দিরগুলোতে পরিকল্পিত ভাঙচুর, দেবতাদের প্রতিমা ভেঙে ফেলা এবং আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এই সব হামলার পেছনে কিছু মৌলিক কারণ রয়েছে। প্রথমত, ধর্মীয় উগ্রবাদের কারণে এই ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ড ঘটছে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক কূটকৌশল এবং ক্ষমতার লড়াইয়ের ফাঁদে পড়ে অনেক সময়ই ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা শিকার হচ্ছেন। তৃতীয়ত, সম্পত্তির লোভ এবং ব্যক্তিগত রোষানলে পড়ে অনেক সময়ই এমন হামলা সংঘটিত হচ্ছে।
এটা সত্যি যে, বাংলাদেশ একটি বহুমাত্রিক সমাজ যেখানে বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি এবং ভাষা সহাবস্থান করছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, কিছু মানুষ এ সৌন্দর্যের অপব্যবহার করে এবং নিজের স্বার্থে সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করে। মন্দিরে হামলা শুধু যে একটি ধর্মীয় স্থান ধ্বংস করে দেয় তাই নয়, বরং তা একটি সম্প্রদায়ের আত্মাকে আঘাত করে। এই ধরনের সহিংসতা আমাদের সমাজের বিভিন্ন স্তরে অনিশ্চয়তা এবং ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করে। এর ফলে, অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে নিরাপত্তার খোঁজে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়।
২০২০ সালে দেখা গেছে, এমন অনেক পরিবার যারা দীর্ঘদিন ধরে এই দেশে বসবাস করছেন, তারা নিজেদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সম্পত্তি ছেড়ে অন্য দেশে চলে যাচ্ছেন। দেশের প্রতি ভালোবাসা, মাটি এবং সংস্কৃতির টান থাকা সত্ত্বেও, জীবনের নিরাপত্তা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। যখন কোনও পরিবার তাদের জন্মভূমি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়, তখন তা গোটা সমাজের জন্য একটি পরাজয়। এই সমস্যাগুলি সমাধান করতে হলে আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা নিতে হবে।
প্রথমত, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার জন্য একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো থাকা দরকার। দ্বিতীয়ত, আমাদের সমাজের মানুষের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। প্রতিবেশীর ধর্ম, সংস্কৃতি এবং বিশ্বাসকে সম্মান জানাতে শিখতে হবে। অথচ এই পরিবর্তন রাতারাতি আসবে না, এর জন্যে শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে সম্প্রীতি বাড়াতে হবে।
তৃতীয়ত, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানকেও এগিয়ে আসতে হবে। ধর্মের নামে সহিংস কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে হবে। ধর্মীয় নেতাদের উচিত হবে, তাদের অনুসারীদের মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া। আমাদের সমাজে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা বাড়াতে হবে, যাতে মানুষ একে অপরের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সহমর্মিতা দেখায়।
ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন কোনও পরিবার দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সেটা আমাদের সমাজের জন্য একটি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় আমরা কি আসলে সবাইকে নিরাপদে রাখতে সক্ষম হচ্ছি? যে দেশটি আমাদের সবকিছু দিয়েছে, সেই দেশ থেকে দূরে গিয়ে বসতি গড়তে বাধ্য হলে সেটা কি আমাদের জন্য একটি বড় ব্যর্থতা নয়? আমাদের সমাজে যদি আসলেই শান্তি ও সম্প্রীতি থাকে, তবে কেন আমাদের মানুষদের ভয় সত্ত্বেও থাকতেই হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের প্রত্যেকেরই একটি স্বচ্ছ আত্মনিরীক্ষণ প্রয়োজন।
পরিশেষে, বলা যায় যে, এই ধরনের ঘটনা আমাদের সমাজের সবচেয়ে গভীর সংকটের প্রতিফলন। আমাদের উচিত হবে এই সংকট দূর করার জন্য একটি শক্তিশালী সামাজিক কাঠামো তৈরি করা। আমরা প্রত্যেকে যদি আমাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে উদ্যোগী হই, তবে হয়তো আগামীতে আমরা একটি সুন্দর সমাজ গড়তে সক্ষম হব। যেখানে মন্দিরে হামলা হবে না, ঘর পুড়বে না এবং কোনও পরিবারকে আর কখনোই নিরাপত্তার জন্য দেশ ছাড়তে হবে না। আমরা কি সেই দিনের স্বপ্ন দেখতে পারি না? আমরা কি সকলে একত্রিত হয়ে এমন এক দেশ গড়তে পারি না যেখানে ধর্ম, সংস্কৃতি এবং সম্প্রদায়ের পার্থক্য আমাদের বিভাজন নয়, বরং আমাদের শক্তি হবে?
