খুলনা–বরিশাল–রংপুরে সংখ্যালঘু জমি হাতবদলের নীরব যুদ্ধের নতুন পর্ব

বছরের পর বছর ধরে আমাদের দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিঃশব্দে এক ধরনের যুদ্ধের মুখোমুখি হয়ে আসছেন। তারা জানেন, এই যুদ্ধটা মাটির সাথে, জমির সাথে। আমাদের দেশের সংখ্যালঘুদের জমি হাতছাড়া হওয়ার ইতিহাস এক সুদীর্ঘ ও জটিল পথ পাড়ি দিয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা, বরিশাল এবং রংপুরের মতো অঞ্চলে জমি হাতবদলের যে নতুন পর্ব শুরু হয়েছে, তা আমাদের দেশের সামাজিক কাঠামো এবং মানবাধিকারের দিকে এক গভীর প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে।

শুরুতেই বলে রাখি, এই লেখার সব তথ্য হয়তো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নয়, বরং বিভিন্ন প্রতিবেদন, সংবাদ এবং স্থানীয় জনসাধারণের সাথে কথাবার্তার ভিত্তিতে। তবে যতটুকু জানি, তার ভিত্তিতে একটি চেষ্টা করবো আপনাদের সাথে এই নীরব যুদ্ধের কাহিনি ভাগ করে নিতে।

খুলনায় শুরু করি। এখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশের বসবাস। তাদের অনেকেরই পূর্বপুরুষের কাছ থেকে প্রাপ্ত জমি যা তাদের জীবিকার প্রধান উৎস। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আমরা লক্ষ্য করেছি, কিছু অসাধু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বিভিন্ন কৌশলে এই জমি হাতিয়ে নিচ্ছে। কখনো ভুয়া দলিল, কখনো আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে, আবার কখনো বা তারা নিজেরাই দলিল দাখিল করে ভুল বুঝিয়ে জমি দখল করে নিচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মদত, যা এই প্রক্রিয়াকে আরো সহজ করেছে। সম্প্রতি এক প্রতিবেশী বলছিলেন, তার এক বন্ধুর পরিবার বেশ কিছু জমি হারিয়েছে যার আইনি লড়াই এখনো চলছে।

বরিশালে গিয়ে দেখা মেলে আরেকটি ভিন্ন চিত্র। ভুয়া দলিলের মাধ্যমে জমি হাতবদল এখানে বেশ প্রচলিত। তবে এখানকার অনেক সংখ্যালঘু পরিবারই এই সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার সাহস রাখে না। অনেক সময় ভয় বা লোকলজ্জার কারণে তারা এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ করতে সাহস পায় না। বরিশালে একবার এক ভুক্তভোগী পরিবারের সাথে আলাপ হয়েছিল। তারা জানালেন, কিভাবে শুধুমাত্র তারা সংখ্যালঘু হওয়ায় তাদের অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়নি।

রংপুরে সম্প্রতি এই ধরনের জমি হাতবদল ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখানে আবার সংখ্যালঘুদের জমি নিয়ে বেশ কিছু সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। অনেক সময় জমি নিয়ে বিরোধের কারণেই হামলা ও হুমকির মুখে পড়তে হয় তাদের। আমার এক বন্ধু, যিনি একটি এনজিও’র সাথে কাজ করেন, তিনি জানালেন, কিভাবে তারা সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টা করছেন। তবে তাদের প্রচেষ্টার সামান্যতা রয়ে গেছে, কারণ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি এবং অসাধু ব্যক্তিদের প্রভাব।

এই তিন অঞ্চলের সংখ্যালঘু জমি হাতবদলের নীরব যুদ্ধে একাধিক ব্যাপার পরিলক্ষিত হয়। প্রথমত, এই প্রক্রিয়ায় সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর জড়িত থাকার বিষয়ে প্রশ্ন ওঠে। দ্বিতীয়ত, আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে যার মাধ্যমে এই জমি হাতবদল হয়। তৃতীয়ত, প্রশাসনের ভেতরের দুর্নীতি ও অবহেলা যা এই সমস্যাকে সমাধানে বাধা দেয়।

আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জমির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তাদের জমি কেবল মাটি নয়, বরং তাদের অস্তিত্ব, তাদের পরিচিতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত। এই জমি হারিয়ে গেলে একটি সম্প্রদায়ের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়ে। তাই আমাদের উচিত এর যথাযথ প্রতিকার নিশ্চিত করা।

শেষমেশ, আমি এই প্রশ্ন রেখে যেতে চাই, আমরা কি সত্যিই এই নীরব যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য প্রস্তুত? আমরা কি আমাদের দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জমির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারব? যদি পারি, তবে সেই পথ কোনটি? যদি না পারি, তবে এর দায়ভার কি শুধুমাত্র প্রশাসনের? নাকি আমাদের সমাজের উপরও কোনো দায়িত্ব বর্তায়? আশা করি, আমরা একসাথে সেই উত্তর খুঁজে বের করতে পারব, কারণ আমাদের দেশের সংখ্যালঘুদের জমি রক্ষার লড়াইটা শুধু তাদের নয়, আমাদের সবার।

By arghya